করোনার সংক্রমণ ৩৩ জেলায় ৯৫%

সারা দেশেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। তবে ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৩টি জেলায় সংক্রমণ বেশি। এসব জেলার প্রতিটিতে রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। দেশে মোট আক্রান্ত রোগীর ৯৫ শতাংশ এই ৩৩ জেলায়। এসব জেলায় সংক্রমণও ঊর্ধ্বমুখী।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে সংক্রমণের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে সংক্রমণ বেশি ছিল। এখনো সেটা আছে। এখন ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত চট্টগ্রাম জেলায়। সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগেও সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। শেরপুর বাদে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার তিনটির (ময়মনসিংহ, জামালপুর ও নেত্রকোনা) প্রতিটিতে রোগী দুই শতাধিক। সিলেটের চারটি জেলার সব কটিতে রোগী শতক ছাড়িয়েছে।

উত্তরাঞ্চলে সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক কম। রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার মধ্যে ৩টিতে এবং রাজশাহীর ৩টি জেলায় আক্রান্ত ১০০ ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত সংক্রমণ সবচেয়ে কম দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে। এই অঞ্চলের বরিশাল বিভাগের কোনো জেলাতেই রোগী এখনো শতক ছাড়ায়নি। খুলনার শুধু যশোরে আক্রান্ত ১০০ ছাড়িয়েছে।

গতকাল সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৪৯ হাজার ৫৩৪ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আইইডিসিআর ৩০ হাজার ৫৪৯ জনের জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান (৩০ মে পর্যন্ত হালনাগাদ) দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি জেলায় রোগীর সংখ্যা শতকের বেশি। এসব জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৯০ জন বা মোট আক্রান্তের ৯৫ দশমিক ২২ শতাংশ।

আইইডিসিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় সদর জেলাগুলোতে অন্য জেলাগুলোর চেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্তের ঘোষণা আসে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। এক মাসের মাথায় ২৬ এপ্রিল খুলে দেওয়া হয় পোশাক কারখানা, ওই দিন থেকে লকডাউন (অবরুদ্ধ) পরিস্থিতি আগের চেয়ে ঢিলেঢালা হয়ে যায়। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর সংক্রমণের দশম সপ্তাহ (১০-১৬ মে) থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে দেখা যায়। ১০০–এর বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে এমন ৩৩টি জেলার মধ্যে ৩১টিতেই ১৬ মের পরের দুই সপ্তাহে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

ঈদকে কেন্দ্র করে ঢিলেঢালা ভাব এবং লোকজনের চলাচল বাড়ায় রোগী বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

দেশের যে ৩৩ জেলায় সংক্রমণ বেশি সেগুলো হলো: ঢাকা বিভাগের ঢাকা, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জ; চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চাঁদপুর; সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেট; ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, জামালপুর ও নেত্রকোনা; রংপুর বিভাগের রংপুর, নীলফামারী ও দিনাজপুর; রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট, বগুড়া ও নওগাঁ এবং খুলনা বিভাগের যশোর জেলা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, টোলারবাগে কার্যকর লকডাউন (অবরুদ্ধ) ছিল বলে সুফল পাওয়া গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে লকডাউন কার্যকর হয়নি। এখানে সংক্রমণও বেশি ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সব খুলে দেওয়ায় সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন উচিত হবে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সেখানে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া। প্রয়োজনে ১৪ দিনের জন্য কারফিউ দেওয়া যায়। এতে সংক্রমণ অনেক কমবে।

এখনো সংক্রমণ বেশি ঢাকায়
শুরু থেকে রাজধানী ঢাকায় কোভিড-১৯–এর প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। এখনো সে প্রবণতা অব্যাহত আছে। এখানে আক্রান্ত রোগী ১৬ হাজার ২৬০ জন (এলাকাভিত্তিক মোট আক্রান্ত রোগীর ৫৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ)। রাজধানীর মধ্যে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি মহাখালীতে, ৪০৮ জন। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী, কাকরাইল, মুগদা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, তেজগাঁও, উত্তরা, গুলশান, বাড্ডা, মালিবাগ, রামপুরা, বাসাবো, পুরান ঢাকার লালবাগ, বাবুবাজার, বংশাল, গেন্ডারিয়া, চকবাজার, ওয়ারী এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে। এসব এলাকার প্রতিটিতে রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানীর বাইরে ঢাকা জেলার অন্য উপজেলাগুলোতে শনাক্ত হয়েছে ৬৬২ জন।

শুরু থেকে রাজধানী ও এর আশপাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে সংক্রমণ বেশি ছিল। আক্রান্তের শীর্ষে থাকা ১০ এলাকার পাঁচটি ঢাকায়। সেগুলো হলো ঢাকা মহানগর, মহানগরের বাইরে ঢাকা জেলা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও মুন্সিগঞ্জ। এখন ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার মধ্যে রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইল ছাড়া বাকি ১১টিতেই আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহে নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে তুলনামূলক আক্রান্তের সংখ্যা কম বেড়েছে।

দ্রুত ছড়াচ্ছে চট্টগ্রামে
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে চট্টগ্রামে। এই বিভাগের তিন পার্বত্য জেলা বাদে বাকি ৮ জেলাতেই রোগীর সংখ্যা ১০০-এর ওপরে। দেশে মোট আক্রান্ত রোগীর ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগে।

ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে আক্রান্তের দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম জেলা। এখানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল ৪ এপ্রিল। তখন থেকে ১৬ মে পর্যন্ত এই জেলায় আক্রান্ত ছিলেন ৬১৯ জন। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ মে পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮৮ জনে। দুই সপ্তাহে এই জেলায় ১ হাজার ৬৬৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে চট্টগ্রামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের যাতায়াত রয়েছে। তাঁদের অবাধ বিচরণই সংক্রমণ বিস্তারের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া পরীক্ষার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে, তাই শনাক্তও বাড়ছে। তিনি মনে করেন, চট্টগ্রামে বেশির ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না।

আক্রান্তের শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে আছে এই বিভাগের কুমিল্লা, কক্সবাজার ও নোয়াখালী। এসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এই জেলাগুলোতে গত দুই সপ্তাহে খুব দ্রুত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ১৭ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ১৪ দিনে কুমিল্লায় ৪৯৩ জন, কক্সবাজারে ৪৭৫ জন এবং নোয়াখালীতে ৪৭০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

উত্তরে শঙ্কা বাড়াচ্ছে বগুড়া ও রংপুর
দেশের উত্তরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে রংপুর জেলায়, ৪১৫ জন। গত দুই সপ্তাহে এই জেলায় আক্রান্ত চিহ্নিত হয়েছেন ২০২ জন। এ ছাড়া নীলফামারী ও দিনাজপুরে আক্রান্ত শতাধিক।

রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার মধ্যে জয়পুরহাট, বগুড়া ও নওগাঁয় রোগী শতক ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ করেই খুব দ্রুততার সঙ্গে রোগী বাড়ছে বগুড়ায়। গত ১৬ মে পর্যন্ত এই জেলায় আক্রান্ত ছিলেন ২৯ জন। আর ৩১ মে পর্যন্ত সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৭ জনে।

বগুড়ার সিভিল সার্জন গউসুল আজিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বগুড়ায় আক্রান্তদের সিংহভাগই ঈদের পর শনাক্ত হয়েছেন। ঈদের আগে ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে করোনায় সংক্রমিত হওয়া ব্যক্তিরা বাড়িতে এসে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করায় সামাজিকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

আরও পড়ুন
Loading...