করোনায় নানা কৌশলে টিউশন ফি নিচ্ছে অনেক স্কুল-কলেজ, বিপাকে অভিভাবকরা

করোনাকালে নানা কৌশলে টিউশন ফি আদায় করছে রাজধানীর স্কুল-কলেজগুলো। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার প্রশ্ন-খাতা, সিলেবাস দেওয়ার নামে স্কুলে ডেকে আনছেন অভিভাবকদের। আর এগুলো নিতে হলে টিউশন ফি পরিশোধ করতে হবে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। এতে ধার-দেনা করেও টিউশন ফি দিতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা।

মিরপুরের গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে চলতি মাসের শেষ থেকে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে চলতি মাসের শুরুর দিকে এসএমএস পাঠানো হয়। বাসায় বসে পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলা হলেও প্রশ্ন ও খাতা প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হবে। তবে এর আগে জুলাই মাস পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়। পরীক্ষার আগে সব রকম বকেয়া ফি পরিশোধ করতে হবে বলে এসএমএসে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়।

অভিভাবকদের কষ্ট হলেও বেতন পরিশোধের পর গত রবিবার আরেকটি এসএমএসে জানানো হয়, ২৪ আগস্ট সোমবার (গতকাল) সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়া হবে। এ জন্য আগস্ট পর্যন্ত সব রকম বকেয়া পরিশোধের রসিদ দেখাতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, ‘অনলাইন ক্লাস তেমনভাবে না হলেও পরীক্ষার কথা বলে আমাদের চাপ দিয়ে বেতন আদায় করা হলো। আর পরীক্ষা হবে অনলাইনে কিন্তু প্রশ্ন নিতে আসতে হয়েছে স্কুলে, এটা কোন ধরনের নিয়ম। করোনার এই সময়ে সব অভিভাবককে স্কুলে জড়ো করে সবাইকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলল। এ ছাড়া স্কুল থেকে খাতা দেওয়ার কথা বলা হলেও সেটা শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’

তবে এ ব্যাপারে গার্লস আইডিয়ালের অধ্যক্ষ নাছরিন নাহারকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। অফিসে ফোন দেওয়া হলেও তাঁরা অধ্যক্ষকে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত ২০ আগস্টের মধ্যে এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন পরিশোধের নোটিশ দিয়েছিল। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন পরিশোধের জন্য বারবার এসএমএস দিচ্ছে। এভাবে প্রায় সব স্কুলই টিউশন ফি পরিশোধে বারবার এসএমএস, ওয়েবসাইটসহ ক্লাসের গ্রুপে নোটিশ দিচ্ছে। এমনকি শ্রেণি শিক্ষকরা অভিভাবকদের ফোনও দিচ্ছেন।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠানই টিউশন ফির জন্য চাপ দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ অগ্রিম বেতনও নিচ্ছে। এটা একেবারেই অমানবিক। আমরা চলতি বছরের ছয় মাসের বেতন মওকুফ বা পুরো বছরের ৫০ শতাংশ বেতন কমানোর জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’

অভিভাবকরা বলছেন, করোনাকালে বেশির ভাগ স্কুলই মে-জুন মাস থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছে। প্রতিদিন দুটি ক্লাসের বেশি নেওয়া হয় না। আবার অনেক স্কুল সপ্তাহে মাত্র তিন দিন ক্লাস নেয়। এই সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনের বাইরে স্কুলগুলোর কোনো খরচ নেই। বিদ্যুৎ, পানির বিলসহ অস্থায়ী যেসব খরচ ছিল সেগুলো হচ্ছে না। এরপর টিউশন ফিতে কোনো প্রকার ছাড় দিচ্ছে না স্কুলগুলো। এমনকি যাঁরা প্রকৃতপক্ষে খুবই সমস্যায় আছেন তাঁদের ক্ষেত্রেও ভাবছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে এক আদেশে, টিউশন ফি আদায়ে চাপ প্রয়োগ না করার জন্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিলে বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে বকেয়াসহ মাসিক বেতন আদায় করতে বলা হয় আদেশে। কিন্তু স্কুলগুলো এই নির্দেশনা আমলেই নিচ্ছে না। অনেক স্কুলের ফান্ডে কোটি কোটি টাকা থাকার পরও তারা কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি তাঁর একাধিক বক্তব্যে অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ উভয়কে মানবিক আচরণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি সচ্ছল অভিভাবকদের বেতন পরিশোধ করতে বলেছেন। আবার যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলার মতো সামর্থ্য আছে, তাদের কিস্তিতে ফি নেওয়া বা কতটা ছাড় দেওয়া যায় সে চেষ্টা করতে বলেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, টিউশন ফি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যই স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের জন্য গাইডলাইন। এর পরও যেহেতু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না স্কুলগুলো, তাই টিউশন ফি নিয়ে নির্দেশনা তৈরির কাজ চলছে। এতে যাঁরা অসচ্ছল অভিভাবক তাঁদের আবেদনের ভিত্তিতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বেতন মওকুফ বা কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে টিউশন ফি নিয়ে আমরা একটি নির্দেশনা তৈরির কাজ শুরু করেছি। সম্প্রতি এসংক্রান্ত একটি রিট আবেদন হওয়ায় সেটা নিষ্পত্তির অপেক্ষা করছি। আদালত যদি কোনো আদেশ দেন সেটা সমন্বয় করেই আমরা শিগগিরই এ ব্যাপারে নির্দেশনা জারি করব।’

আরও পড়ুন
Loading...